প্রতিষ্ঠা
১৯৮১ সালের ৬ জুলাই মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্দীপ্ত একদল স্বপ্নদর্শী নতুনের আহŸানে, সনিষ্ঠ প্রয়াসে ও তেজোদ্দীপ্ত অঙ্গীকারে লোক নাট্যদলের প্রতিষ্ঠা। যাত্রা শুরু হয়েছিলো সুস্থ, সুন্দর ও জীবন-ঘনিষ্ট নাটক মঞ্চায়নের অঙ্গীকারে। লোক নাট্যদল গত চুয়াল্লিশ বছর ধরে মন্ত্রোচ্চারনের মত এ অঙ্গীকার ধারণ করে এগিয়ে চলেছে, তৈরী করেছে নিজস্ব চলার পথ।
প্রযোজনা
বিগত চার দশকে লোক নাট্যদল যেমন দেশীয় নাট্যকারদের মৌলিক নাটক প্রযোজনা করেছে তার পাশাপাশি বিশ্ব-বিখ্যাত বিদেশী নাট্যকারদের নাটকও মঞ্চস্থ করেছে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী লোকজ সাহিত্য ও জনপ্রিয় লোক নাট্য নীরিক্ষাধর্মী আঙ্গিকে মঞ্চে উপস্থাপন করেছে। পথচলার শুরু মিউজিক্যাল কমেডি দিয়ে যা বাংলাদেশেরও প্রথম মিউজিক্যাল কমেডি। ভরতেন্দু হরিশচন্দ্রের ‘অন্ধ নগরীর চৌপাট রাজা’ দলের প্রথম প্রযোজনা। উইলিয়াম শেক্সপীয়ারের ‘এ মিড সামার নাইট্স ড্রিম’ লোক নাট্যদলের দ্বিতীয় প্রযোজনা। তৃতীয় প্রযোজনা, এষ্টাবিøশমেন্ট বিরোধী পথনাটক ‘অতঃপর হরেন মন্ডল’। কেবল নারী নাট্যকর্মীদের নিয়ে ‘সৃষ্টি’ চতুর্থ প্রযোজনা। পঞ্চম প্রযোজনা ‘রথযাত্রা’র মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথম রবীন্দ্রনাথের নাটককে রাজপথে প্রদর্শনের উদাহরণ সৃষ্টি করে লোক নাট্যদল। ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’ ষষ্ঠ প্রযোজনা। দলের সপ্তম প্রযোজনা বিখ্যাত ফরাসী নাট্যকার মলিয়ের-এর অন্যতম সেরা কমেডি ‘দ্য মাইজার’ অবলম্বনে ‘কঞ্জুস’। নাটকটি দেশে-বিদেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে এবং এটি এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশের সর্বাধিক মঞ্চায়িত নাটক।
বের্টোল্ট ব্রেখ্ট-এর ‘একসেপশন এ্যান্ড দ্য রুল’ অবলম্বনে ‘বিধি ও ব্যতিক্রম’ দলের অষ্টম প্রযোজনা। মুনীর চৌধুরীর ‘মানুষ’, মনোজ মিত্রের ‘টাপুর টুপুর’ এবং কাজী নজরুল ইসলামের ‘শিল্পী’ যথাক্রমে নবম, দশন ও একাদশ প্রযোজনা। গ্রিক নাট্যকার ইউরিপিদিস-এর ‘হেলেন’ দ্বাদশ প্রযোজনা। মানিক বন্দোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র নাট্যরূপ দলের ত্রয়োদশ প্রযোজনা। মৌলবাদ-বিরোধী ফিজিক্যাল থিয়েটার ‘নির্মূল’ চতুর্দশ প্রযোজনা। বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী যাত্রপালা ও পদাবলী কীর্তনের সংমিশ্রনে নিরীক্ষাধর্মী প্রযোজনা ময়মনসিংহ গীতিকা অবলম্বনে পদাবলী যাত্রা ‘সোনাই মাধব’ লোক নাট্যদলের পঞ্চদশ প্রযোজনা। বুদ্ধদেব বসু’র বিখ্যাত নাটক ‘তপস্বী ও তরঙ্গিনী’ ষোড়শ প্রযোজনা। ফিজিক্যাল থিয়েটার ‘মহাপ্রয়াণ’ ও ‘নির্মাণ’ সপ্তদশ ও অষ্টাদশ প্রযোজনা।
লোক নাট্যদলের ঊনিশতম প্রযোজনা কাজী নজরুল ইসলাম-এর ‘মধুমালা’। সংস্কৃত নাটক ‘ভগবদজ্জুকিয়াম’ অবলম্বনে মোহিত চট্টোপধ্যায়ের ‘সিদ্ধিদাতা’ বিশতম প্রযোজনা। নোবেলজয়ী চীনা সাহিত্যিক গাও সিংজিয়ান-এর ‘মাঝরাতের মানুষেরা’ দলের একুশতম প্রযোজনা। মোহিত চট্টোপাধ্যায়-এর আরেকটি নাটক ‘তুষাগ্নি’ বাইশতম প্রযোজনা। তেইশতম প্রযোজনা শুভঙ্কর চক্রবর্তীর ‘মড়া’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর সার্ধশত জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে লোক নাট্যদল মঞ্চে এনেছে চব্বিশ ও পঁচিশতম প্রযোজনা যথাক্রমে ‘বশীকরণ’ ও ‘বৈকুন্ঠের খাতা’। উল্লেখ্য ‘বৈকুন্ঠের খাতা’ বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনুদানপ্রাপ্ত। দলের ছাব্বিশতম প্রযোজনা মলয় ভৌমিকের ‘সুনাগরিকের সন্ধানে’। সাতাশতম প্রযোজনা আবদুল্লাহ আল হারুন-এর ‘পরগাছা’। আটাশতম প্রযোজনা মুক্তিযুদ্ধ-ভিত্তিক নাটক উৎপল দত্ত-এর ‘ঠিকানা’। ঊনত্রিশতম প্রযোজনা ‘জাস্টিস ইনজাষ্টিস’। ত্রিশতম প্রযোজনা মোহিত চট্টোপধ্যায়-এর ‘সুন্দর’। একত্রিশতম প্রযোজনা ‘চন্দ্রালোক’।
উৎসব-পার্বন
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নিয়মিত নাট্য প্রদর্শনীর বাইরে প্রায় প্রতি বছরই কোন না কোন উৎসব অথবা বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আসছে লোক নাট্যদল। বিশেষ কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা হলো।
১৯৮৯ সালে দলের অষ্টম প্রতিষ্ঠবার্ষিকীতে একসাথে তিনটি নতুন নাটকের মঞ্চায়নসহ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়। ১৯৯১ সালে আয়োজন করা হয় চারদিন ব্যাপী ‘মলিয়ের কমেডি উৎসব’ । এত লোক নাট্যদল ছাড়াও নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, নাট্যচক্র ও নাট্যকেন্দ্র অংশগ্রহণ করে। ১৯৯৩ সালে আয়োজন করা হয় ‘লোক নাট্যদলের এক যুগ পূর্তি উৎসব’। প্রতিষ্ঠার ১৫ বছর পূর্তিতে দলের নিজস্ব প্রযোজনাসমূহ নিয়ে ১৯৯৬ সালে আয়োজন করা হয় তিন দিনের নাট্যোৎসব। আবারো শুধুমাত্র লোক নাট্যদলের আটটি নাটক নিয়ে আয়োজন করা হয় ১৯৯৮ সালে আয়োজন করা হয় ‘লোক নাট্যদল নাট্য উৎসব’। ২০০১ সালে আয়োজন করা হয় ‘দুই দশক পূর্তি অনুষ্ঠান’। ২০০৬ সালে দলের রজত জয়ন্তীতে বছরব্যাপী অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়। ভারতের ২টি ও বাংলাদেশের ৫টি নাট্যদলের আটটি নাটক নিয়ে আয়োজন করা হয় ৮দিনব্যাপী ‘তিনদশক পূর্তি নাট্যোৎসব ২০১১’। সোনাই মাধব নাটকের ১৫০তম মঞ্চায়ন উপলক্ষ্যে বাংলাদেশের ৬টি নাট্যদলের শুধুমাত্র ময়মনসিংহ গীতিকা-ভিত্তিক ৬টি নাটক নিয়ে আয়োজন করা হয় ‘ময়মনসিংহ গীতিকা নাট্যোৎসব-২০১৪’। কঞ্জুস নাটকের ১০০, ২০০, ৩০০, ৪০০, ৫০০ ও ৬০০তম মঞ্চায়ন উপলক্ষ্যে বিশেষ অনুষ্ঠামালার আয়োজন করা হয়। সোনাই মাধবের ১০০, ১৫০তম ও ২০০তম মঞ্চায়নেরও আয়োজন করা হয়। ‘বৈকুন্ঠের খাতা’ নাটকের ৫০তম মঞ্চায়ন অনুষ্ঠিত হয় ২০২৩ সালে।
মানবিক কর্মকান্ডে লোক নাট্যদল
নাট্যক্রিয়ার পাশাপাশি দেশের যে কোন মানবিক দূর্যোগে আর্ত মানবতার সাহায্যে হাত বাড়িয়ে দেয়াকে লোক নাট্যদল কর্তব্য বলে মনে করে। বিভিন্ন সময়ে নাট্য প্রদর্শনীর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করে প্রাকৃতিক দূর্যোগে বা দূরারোগ্য ব্যাধীতে আক্রান্ত অসহায় মানুষদের সাহায্য করে আসছে লোক নাট্যদল।
১৯৯১ সালে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সাহায্যার্থে মলিয়ের কমেডি সপ্তাহ, ২০০৬ সালে ক্যান্সার আক্রান্ত নাট্যকর্মী জগলুল আলমের চিকিৎসা সাহায্যার্থে, ২০০৭ সালে বন্যার্তদের ও একই বছর ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ‘সিডর’এ ক্ষতিগ্রস্ত উপক‚লীয় অঞ্চলের মানুষের সাহায্যার্থে, ২০০৭ ও ২০০৮ সালে পরপর দু’বার বাংলাদেশ মহিলা সমিতি পরিচালিত এস.এ ব্রেস্ট ক্যান্সার কেয়ার এ্যান্ড রিসার্চ ইন্সটিটিউটের তহবিল সংগ্রহের জন্য, ২০০৭ সালে ক্যান্সার আক্রান্ত অসহায় কিশোর অনুপ, ২০০৮ সালে ক্যান্সার আক্রান্ত নাট্যজন জিয়া হায়দার, ২০০৯ সালে ক্যান্সার আক্রান্ত রূপসজ্জা শিল্পী তপন কুমার দাস, ২০১২ সালে নাট্যকর্মী লক্ষন সিনহা, ২০১৩ সালে নাট্যকর্মী দেবজ্যোতি সেন শর্মা, ২০১৭ সালে খ্যাতিমান মুক্তিযোদ্ধা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিনীসহ আরো অনেক অসংখ্য মানুষের চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তায় লোক নাট্যদল নাট্য প্রদর্শনীর মাধ্যমে অর্জিত অর্থ ব্যয় করেছে। এছাড়া কোভিড -এর সময় নাট্য প্রদর্শনী বন্ধ হয়ে গেলে লোক নাট্যদল নেপথ্যের পেশাদার নাট্যশিল্পী ও নাট্যকর্মীদের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছে।
নাট্যকর্মী পদক
এদেশের গ্রæপ থিয়েটার আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে আগ্রণী ভ‚মিকা ও বিশেষ আবদানের স্বীকৃতি প্রদানের উদ্দেশ্যে লোক নাট্যদল ১৯৯১ সাল থেকে নাট্যকর্মী পদক প্রবর্তন করে। ১৯৯১ সালে মোহাম্মদ জাকারিয়াকে নাট্যকর্মী পদকে ভ‚ষিত করা হয়। ১৯৯২ সালে দেশের দশজন নাট্যকর্মী সৈয়দ জামিল আহমেদ, শিশির দত্ত, আহমেদ ইকবাল হায়দার, মিন্টু বসু, নাজমুল আহসান, এ কে এম আব্দুল কুদ্দুস মিয়া, মলয় ভৌমিক, মহসিন আলী, আলী আফরোজ পিনু, ও আমিনুর রহমান ফরিদকে নাট্যকর্মী পদক প্রদান করা হয়। ১৯৯৩ সালে এ পদক প্রদান করা হয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরী ও আতাউর রহমানকে। সৈয়দ শামসুল হক, আলী যাকের, রামেন্দু মজুমদার, ফেরদৌসী মজুমদার ও নাসিরউদ্দিস ইউসুফকে নাট্যকর্মী পদক-১৯৯৪ প্রদান করা হয়। ১৯৯৫ সালে আবদুল্লাহ আল মামুন, মামুনুর রশীদ ও আসাদুজ্জামান নূরকে পদক প্রদান করা হয়। সাঈদ আহমেদ ও জিয়া হায়দার ১৯৯৬ সালে এ পদক লাভ করেন। ১৯৯৭ সালে সেলিম আল দীন, ম. হামিদ ও নাজমা আনোয়ার এবং ১৯৯৮ সালে সারা যাকের, শিমুল ইউসুফ ও সুবর্না মুস্তফা এ পদক লাভ করেন। ১৯৯৯ সালে আবুল হায়াত ও হুমায়ুন ফরীদিকে নাট্যকর্মী পদক প্রদান করা হয়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লোক নাট্যদল
বাংলাদেশের নাটককে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উপস্থাপন করার জন্য লোক নাট্যদল এবং এই দলের কর্মীদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত পিপল্স থিয়েটার এসোসিয়েশনের এক বিরাট ভ‚মিকা রয়েছে। লোক নাট্যদল তার প্রযোজনাগুলো নিয়ে ভারতে বিভিন্ন রাজ্যসহ নেপাল, হংকং, জাপান, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া, মোনাকো, ইংল্যান্ড প্রভৃতি দেশের বিভিন্ আন্তর্জাতিক উৎসবে মঞ্চস্থ করার মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে এবং বাংলাদেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে বিশ্ব-দরবারে পরিচিত করাতে ব্যাপক ভুমিকা রেখেছে।
আন্দোলন সংগ্রামে লোক নাট্যদল
নাটকের মাধ্যমে সামাজিক দায়িত্ব পালনের যে অঙ্গীকার তার বাস্তবায়ন শুধু একটি দলের পক্ষে সম্ভব নয়। সেজন্য লোক নাট্যদল বাংলাদেশ গ্রæপ থিয়েটার ফেডারেশান, পথনাটক পরিষদ এবং সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে এদেশের নাট্য ও সাংস্কৃতিক এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভ‚মিকা রেখেছে। নাট্য ও সংস্কৃতিকর্মীদের অধিকার আদায়ে বাংলাদেশ গ্রæপ থিয়েটার ফেডারেশানের সকল কার্যক্রমে সর্বদাই যুক্ত আছে লোক নাট্যদল।
গণমুখী নাট্যচর্চা, শিশু-কিশোরদের থিয়েটার আন্দোলন ও পিপল্স থিয়েটার এসোসিয়েশন
সারা দেশব্যাপী নাট্যান্দোলনকে শক্তিশালী করার জন্য লোক নাট্যদল একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করে ১৯৯১ সালের ১ জানুয়ারি পিপল্স থিয়েটার এসোসিয়েশন (পিটিএ) গঠনের মাধ্যমে। পিটিএ’র কর্মকান্ডের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো শিশু নাট্য আন্দোলন, নাট্য তথ্য ব্যাংক, জননাট্য আন্দোলন ও পিপল্স লিটল থিয়েটার। সারাদেশে শিশু-কিশোরদেরকে নাটকের সাথে যুক্ত করার জন্য পিপল্স থিয়েটার এসোসিয়েশন কর্তৃক জাতীয় শিশু-কিশোর নাট্যোৎসবের আয়োজন এক্ষেত্রে ভ‚মিকা রেখেছে। ১৯৯৪ সালে প্রথম জাতীয় নাট্য তথ্য প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। জননাট্য আন্দোলন পিটিএ’র আরেকটি উদ্যোগ যা ‘খোলা নাটক’ মঞ্চায়নের মাধ্যমে গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে।

